logo

HOMOEOPATHY DOCTOR

📚 Home

অগ্রসর কর্মী মানয়োন্নয়ন গাইড

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য দরস, বই নোট, বিষয়ভিত্তিক আয়াত-হাদিস ও মাসয়ালা সংকলন

অনুশীলনী- ০৬ঃ মার্চ- ৪র্থ সপ্তাহঃ
# দারস তৈরী - সূরা আলাক (১-৫ নং আয়াত) # বই নোট: ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় # দাওয়াত সংক্রান্ত আয়াত ,আল ইমরান-১০৪, ইউসূফ-১০৮, আন নাহল-১২৫, হামীম আস সাজদাহ-৩৩, মায়েদা-৬৭, # দাওয়াত সংক্রান্ত হাদিস # সিয়াম সংক্রান্ত মাসয়ালা

দারস তৈরী -সূরা সূরা আলাক (১-৫ নং আয়াত)

দারস - সূরা আলাক (১-৫ নং আয়াত)

পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী, তাফসীর ও শিক্ষা

এক নজরে

  • নাম: আল আলাক্ব
  • মর্যাদা: প্রথম নযিলকৃত সূরা
  • আয়াত সংখ্যা: ১৯টি (প্রথম ৫টি নাযিল হয়)
  • অবতীর্ণ হওয়ার স্থান: মক্কায় অবতীর্ণ

নামকরণ: সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখিত আলাক ( خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ) শব্দ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে।

মূল আয়াত, উচ্চারণ ও অনুবাদ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ

১. ইক¦রা বিছমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক
১. পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ
২. খালাকাল ইংছা-না মিন'আলাক
২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।
اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ
৩. ই ক্বরা ওয়া রাব্বুকাল আকরাম
৩. পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালক পরম দয়ালু।
الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ
৪. আল্লাযী 'আল্লামা বিলা ক্বালাম
৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।
عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
৫. 'আল্লামাল ইনছা-না মা-লাম ইয়া'লাম
৫. শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।

নাযিলের সময়কাল

এই সূরাটির দু’টি অংশ। প্রথম অংশটি (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ) থেকে শুরু হয়ে পঞ্চম আয়াতে (عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ) এ গিয়ে শেষ হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশটি (كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ ) থেকে শুরু হয়ে সূরার শেষ পর্যন্ত চলেছে।

প্রথম অংশটি যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ সর্বপ্রথম অহী এ ব্যাপারেও উম্মাতে মুসলিমার আলেম সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ একমত। এ প্রসংগে ইমাম আহমাদ, বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ অসংখ্য সনদের মাধ্যমে হযরত আয়েশা (রা) থেকে যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তা সর্বাধিক সহীহ হাদীস হিসেবে গণ্য। এ হাদীসে হযরত আয়েশা নিজে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ওহী শুরু হবার সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে বর্ণনা করেছেন।

এ ছাড়াও ইবনে আব্বাস (রা), আবু মূসা আশ’আরী (রা) ও সাহাবীগণের একটি দলও একথা বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম কুরআনের এই আয়াতগুলোই নাযিল হয়েছিল। আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হারম শরীফে নামায পড়া শুরু করেন এবং আবু জেহেল তাঁকে হুমকি দিয়ে তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে তখন দ্বিতীয় অংশটি নাযিল হয়।

অহীর সূচনা

মুহাদ্দিসগণ অহীর সূচনাপর্বের ঘটনা নিজের নিজের সনদের মাধ্যমে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম যুহরী এ ঘটনা হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর থেকে এবং তিনি নিজের খালা হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহীর সূচনা হয় সত্য স্বপ্নের (কোন কোন বর্ণনা অনুসারে ভালো স্বপ্নের) মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, মনে হতো যেন দিনের আলোয় তিনি তা দেখছেন। এরপর তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়েন। এরপর কয়েকদিন হেরা গুহায় অবস্থান করে দিনরাত ইবাদাতের মধ্যে কাটিয়ে দিতে থাকেন, হযরত আয়েশা রা. তাহানুস (طحنوش) শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইমাম যুহরী তা’আব্বুদ (طعبد) বা ইবাদাত - বন্দেগী শব্দের সাহায্যে এর ব্যাখ্যা করেছেন। (এখানে তিনি কোন ধরনের ইবাদাত করতেন? কারণ তখনো পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবাদাতে পদ্ধতি তাঁকে শেখানো হয়নি)

ঘর থেকে খাবার - দাবার নিয়ে তিনি কয়েকদিন সেখানে কাটাতেন। তারপর হযরত খাদীজার (রা) কাছে ফিরে আসতেন। তিনি আবার কয়েক দিনের খাবার সামগ্রী তাঁকে যোগাড় করে দিতেন। একদিন তিনি হেরা গুহার মধ্যে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ওপর ওহী নাযিল হলো। ফেরেশতা এসে তাঁকে বললেন : “পড়ো”।

এর পর হযরত আয়েশা (রা) নিজেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন : আমি বললাম, “আমি তো পড়তে জানি না।” একথায় ফেরেশতা আমাকে ধরে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন। এমনকি আমি তা সহ্য করার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেল্লাম। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ো”। আমি বলালাম, “আমি তো পড়তে জানি না।” তিনি দ্বিতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ধরে ভয়ানক চাপ দিলেন। আমার সহ্য করার শক্তি প্রায় শেষ হতে লাগলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ো”। আমি আবার বলালাম, “আমি তো পড়া জানি না”। তিনি তৃতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন আমার সহ্য করার শক্তি খতম হবার উপক্রম হলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ) (পড় নিজের রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন) এখানে থেকে (عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ - যা সে জানতো না) পর্যন্ত।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁপতে কাঁপতে সেখান থেকে ফিরলেন। তিনি হযরত খাদীজার (রা) কাছে ফিরে এসে বললেন, “আমার গায়ে কিছু (চাঁদর - কম্বল) জড়িয়ে দাও! আমার গায়ে কিছু (চাঁদর - কম্বল) জড়িয়ে দাও!” তখন তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেয়া হলো। তাঁর মধ্য থেকে ভীতির ভাব দূর গেলে তিনি বললেন : “হে খাদীজা! আমার কি হয়ে গেলো?” তারপর তিনি তাঁকে পুরো ঘটনা শুনিয়ে দিলেন এবং বললেন, “আমার নিজের জানের ভয় হচ্ছে।”

হযরত খাদীজা বললেন : “মোটেই না। বরং খুশী হয়ে যান। আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমাণিত করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করেন। সত্য কথা বলেন। (একটি বর্ণনায় বাড়তি বলা হয়েছে, আপনি আমানত পরিশোধ করে দেন, অসহায় লোকদের বোঝা বহন করেন। নিজে অর্থ উপার্জন করে অভাবীদেরকে দেন। মেহমানদারী করেন। ভালো কাজে সাহায্য করেন।)”

তারপর তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই। জাহেলী যুগে তিনি ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আরবী ও ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। হযরত খাদীজা (রা) তাঁকে বললেন, “ভাইজান! আপনার ভাতিজার ঘটনাটা একটু শুনুন।” ওয়ারাকা রসূলুল্লাহকে বললেন : “ভাতিজা! তুমি কি দেখেছো?” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু দেখেছিলেন তা বর্ণনা করছেন। ওয়ারাকা বললেন : “ইনি সেই নামূস (অহী বহনকারী ফেরেশতা) যাকে আল্লাহ মূসার (আ) ওপর নাযিল করেছিলেন। হায়, যদি আমি আপনার নবুওয়াতের জামানায় শক্তিশালী যুবক হতাম! হায়, যদি আমি তখন জীবিত থাকি যখন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে।”

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : “এরা আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেন : “হাঁ, কখনো এমনটি হয়নি, আপনি যা নিয়ে এসেছেন কোন ব্যক্তি তা নিয়ে এসেছে এবং তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। যদি আমি আপনার সেই আমলে বেঁচে থাকি তাহলে আপনাকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করবো।” কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই ওয়ারাকা ইন্তিকাল করেন।

এ ঘটনা নিজেই একথা প্রকাশ করছে যে, ফেরেশতার আসার এক মূহূর্ত আগেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নবী বানিয়ে পাঠানো হবে এ সম্পর্কে তিনি বিন্দুবিসর্গও জানতেন না। তাঁর এই জিনিসের প্রত্যাশী বা আকাংক্ষী হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর সাথে যে এই ধরনের ব্যাপার ঘটতে পারে, একথা তিনি আদৌ কখনো কল্পনা করতে পারেননি। অহী নাযিল হওয়া এবং ফেরেশতার এভাবে সামনে এসে যাওয়া তাঁর জন্যে ছিল একটি আকস্মিক ঘটনা। এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তাঁর ওপর ঠিক তাই হয়েছে যা একজন বেখবর ব্যক্তির সাথে এত বড় একটি আকস্মিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে। এ কারণেই যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এগিয়ে আসেন তখন মক্কার লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধে সব রকমের আপত্তি উঠায় কিন্তু তাদের একজনও একথা বলেনি, আমরা তো আগেই আশংকা করেছিলাম আপনি কোন একটি কিছু হওয়ার দাবী করবেন, কারণ আপনি বেশ কিছু কাল থেকে নবী হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এ ঘটনা থেকে নবুওয়াতের আগে তাঁর জীবন কেমন পবিত্র ছিল এবং তাঁর চরিত্র ও কর্মকাণ্ড কত উন্নত পর্যায়ের ছিল সে কথাও জানা যায়। হযরত খাদীজা (রা) কোন অল্প বয়স্কা মহিলা ছিলেন না। বরং এই ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল পঞ্চান্ন বছর। পনের বছর ধরে তিনি রসূলের জীবন সঙ্গিনী ছিলেন। স্ত্রীর কাছে স্বামীর কোন দুর্বলতা গোপন থাকতে পারে না। তিনি রসূলুল্লাহর (সা) ৫০ বছরের জিন্দেগীকে এত উন্নত ও পবিত্র হিসেবে পেয়েছিলেন যে, যখনই তিনি তাঁকে হেরা গুহার ঘটনা শুনান তখনই নির্দ্বিধায় তিনি স্বীকার করে নেন যে, যথার্থই আল্লাহর ফেরেশতা তাঁর কাছে অহী নিয়ে এসেছিলেন। অনুরূপভাবে ওয়ারাকা ইবনে নওফলও মক্কার একজন বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ছিলেন। তিনি শৈশব থেকে মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহর (সা) জীবন দেখে আসছিলেন, তাছাড়া পনের বছরের নিকট আত্মীয়তার কারণে তাঁর অবস্থা তিনি আরো গভীরভাবে অবগত ছিলেন। তিনিও এ ঘটনা শুনে একে কোন প্ররোচনা মনে করেননি। বরং শুনার সাথে সাথেই বলে দেন, ইনি সেই একই “নামূস” যিনি মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসেছিলেন। এর অর্থ এই দাঁড়ায় তাঁর মতেও মুহাম্মাদ (সা) এমনই উন্নত ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে, তাঁর নবুওয়াতের মর্যাদা লাভ করা কোন বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না।

দ্বিতীয় অংশ নাযিলের প্রেক্ষাপট

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কা’বা শরীফে ইসলামী পদ্ধতিতে নামায পড়তে শুরু করেন এবং আবু জেহেল তাঁর হুমকি দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে, ঠিক সে সময় এই সূরার দ্বিতীয় অংশটি নাযিল হয়। দেখা যায়, নবী হবার পর প্রাকশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেবার কাজ শুরু করার আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর শেখানো পদ্ধতিতে হারম শরীফে নামায পড়তে শুরু করেন এবং এ কাজটির কারনে কুরাইশরা প্রথমবার অনুভব করে যে, তিনি কোন নতুন দীনের অনুসারী হয়েছেন। অন্য লোকেরা অবাক চোখে এ দৃশ্য দেখছিল। কিন্তু আবু জেহেল জাহেলী শিরা - উপশিরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং সে এভাবে হারম শরীফে ইবাদাত করা যাবে না বলে তাঁকে ধমকাতে থাকে।

এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে কয়েকটি হাদীসে আবু জেহেলের এতদসংক্রান্ত বিভিন্ন দুষ্কৃতি উল্লেখিত হয়েছে।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন: আবু জেহেল কুরাইশদেরকে জিজ্ঞেস করে, “মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তোমাদের সামনে যমীনের ওপর মুখ রাখছে?” লোকেরা জবাব দেয়, “হাঁ”। একথায় সে বলল, “লাত ও উয্যার কসম, যদি আমি তাকে এভাবে নামায পড়তে দেখি তাহলে তার ঘাড়ে পা রেখে দেবো এবং মাটিতে তার মুখ রগড়ে দেবো।” তারপর একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামায পড়তে দেখে সে তাঁর ঘাড়ের ওপর পা রাখার জন্যে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্ত হঠাৎ লোকেরা দেখে সে পিছনের দিকে সরে আসছে এবং কোন জিনিস থেকে নিজের মুখ বাঁচাবার চেষ্টা করছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার কি হয়েছে? সে বলে, আমার ও তার মাঝখানে আগুনের একটি পরিখা, একটি ভয়াবহ জিনিস ও কিছু ডানা ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সে যদি আমার ধারে কাছে ঘেঁসতো তাহলে ফেরেশতারা তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। (আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, ইবনুল মুনযির, ইবনে মারদুইয়া, আবু নাঈম ইসফাহানী ও বায়হাকী)

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: আবু জেহেল বলে, যদি আমি মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কা’বার কাছে নামায পড়তে দেখি তাহলে পায়ের নীচে তার ঘাড় চেপে ধরবো। একথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে পৌঁছে যায়। তিনি বলেন, যদি সে এমনটি করে তাহলে ফেরেশতারা প্রকাশ্যে তাকে এসে ধরবে। (বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে জারীর, আবদুর রাজ্জাক, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনুল মুনযির ও ইবনে মারদুইয়া)

ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে: রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়ছিলেন, আবু জেহেল সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। সে বললো, হে মুহাম্মাদ! আমি কি তোমাকে এ থেকে নিষেধ করিনি? একথা বলে সে তাঁকে ধমকাতে শুরু করলো। জবাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কঠোরভাবে ধমক দিলেন। তাঁর ধমকানি শুনে সে বললো, হে মুহাম্মাদ! কিসের জোরে তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো? আল্লাহর কসম! এই উপত্যকায় আমার সমর্থকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে জারীর, ইবনে আবী শাইবা, ইবনুল মুনযির, তাবারানী ও ইবনে মারদুইয়া)

এ ঘটনাবলীর কারণে (كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ) থেকে সূরার যে অংশটি শুরু হচ্ছে সেটি নাযিল হয়। কুরআনের এই সূরাটিতে এই অংশটিকে যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে স্বাভাবিকভাবে এর মর্যাদা তাই হওয়া উচিত। কারণ প্রথম অহী নাযিল হবার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের প্রথম প্রকাশ করেন নামাযের মাধ্যমে এবং এই ঘটনার ভিত্তিতেই কাফেরদের সাথে তাঁর প্রথম সংঘাত হয়।

আয়াতভিত্তিক তাফসীর ও দরস

১. اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ

পড়ো (হে নবী), তোমার রবের নামে ৷ যিনি সৃষ্টি করেছেন৷

  1. ইতিপূর্বে ভূমিকায় বলে এসেছি, ফেরেশতা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, পড়ো। তিনি জবাবে দিলেন, আমি পড়া জানি না। এ থেকে জানা যায়, ফেরেশতা অহীর এই শব্দগুলো লিখিত আকারে তাঁর সামনে পেশ করেছিলেন এবং তাঁকে সেগুলো পড়তে বলেছিলেন। কারণ ফেরেশতার কথার অর্থ যদি এই হতো, আমি বলতে থাকি এবং আপনি পড়তে থাকুন তাহলে আমি পড়া জানি না একথা বলা তাঁর প্রয়োজন হতো না।
  2. অর্থাৎ তোমার রবের নাম নিয়ে পড়ো। অন্য কথায়, বিসমিল্লাহ বলো এবং পড়ো। এ থেকে একথাও জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অহী আসার আগে একমাত্র আল্লাহকেই জানতেন ও মানতেন। এ জন্যই তাঁর রবকে, একথা বলার প্রয়োজন হয়নি বরং বলতে হয়েছে, তোমার রবের নাম নিয়ে পড়ো।
  3. শুধু বলা হয়েছে, "সৃষ্টি করেছেন।" কাকে সৃষ্টি করেছেন তা বলা হয়নি। এ থেকে আপনা আপনিই এ অর্থ বের হয়ে আসে, সেই রবের নাম নিয়ে পড়ো যিনি স্রষ্টা, যিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহান এবং বিশ্ব-জাহানের প্রতিটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন।
২. خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ

জমাট বাঁধা রক্তের দলা থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন৷

  1. সাধারণ ভাবে বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টির কথা বলার পর বিশেষ করে মানুষের কথা বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ কেমন হীন অবস্থা থেকে তার সৃষ্টিপর্ব শুরু করে তাকে পূর্ণাংগ মানুষে রূপান্তরিত করেছেন। আলাক (عَلَقٍ) হচ্ছে আলাকাহ (عالاقه) শব্দের বহুবচন। এর মানে জমাট বাঁধা রক্ত। গর্ভ সঞ্চারের পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় এটি হচ্ছে সেই প্রাথমিক অবস্থা। তারপর তা গোশতের আকৃতি ধারণ করে। এরপর পর্যায়ক্রমে মানুষের আকৃতি লাভের কার্যক্রম শুরু হয়।
৩. اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ

পড়ো, এবং তোমার রব বড় মেহেরবান,

৪. الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ

যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন৷

  1. অর্থাৎ তাঁর অশেষ মেহেরবানী। এই হীণতম অবস্থা থেকে শুরু করে তিনি মানুষকে জ্ঞানের অধিকারী করেছেন এটি সৃষ্টির সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে স্বীকৃত। আর তিনি মানুষকে কেবল জ্ঞানের অধিকারীই করেননি, কলম ব্যবহার করে তাকে লেখার কৌশল শিখিয়েছেন। এর ফলে কলম জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার, উন্নতি এবং বংশানুক্রমিক প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যদি তিনি ইলহামী চেতনার সাহায্যে মানুষকে কলম ব্যবহার করার ও লেখার কৌশল না শেখাতেন তাহলে মানুষের জ্ঞানগত যোগ্যতা স্তব্ধ ও পংগু হয়ে যেতো। তার বিকশিত ও সম্প্রসারিত হবার এবং বংশানুক্রমিক অগ্রগতি তথা এক বংশের জ্ঞান আর এক বংশে পৌঁছে যাবার এবং সামনের দিকে আরো উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করার সুযোগই তিরোহিত হতো।
৫. عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ

মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না৷

  1. অর্থাৎ মানুষ আসলে ছিল সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন। আল্লাহর কাছ থেকে সে যা কিছু জ্ঞান লাভ করেছে। আল্লাহ যে পর্যায়ে মানুষের জন্য জ্ঞানের দরজা যতটুকু খুলতে চেয়েছেন ততটুকুই তার জন্য খুলে গিয়েছে। আয়াতুল কুরসীতে একথাটি এভাবে বলা হয়েছে: وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِهٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ”আর লোকেরা তাঁর জ্ঞান থেকে তিনি যতটুকু চান তার বেশী কিছুই আয়ত্ব করতে পারে না। " (আল বাকারাহ ২৫৫) যেসব জিনিসকে মানুষ নিজের তাত্বিক আবিস্কার বলে মনে করে সেগুলো আসলে প্রথমে তার জ্ঞানের আওতায় ছিল না। আল্লাহ যখন চেয়েছেন তখনই তার জ্ঞান তাকে দিয়েছে। মানুষ কোনক্রমেই অনুভব করতে পারেনি যে, আল্লাহ তাকে এ জ্ঞান দান করছেন।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল সেগুলোর আলোচনা এখান পর্যন্ত শেষ। যেমন হযরত আয়েশার (রা) হাদীস থেকে জানা যায়: এই প্রথম অভিজ্ঞতাটি খুব বেশী কঠিন ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাইতে বেশী বরদাশত করতে পারতেন না। তাই তখন কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে যে, তিনি যে রবকে প্রথম থেকে জানেন ও মানেন তিনি সরাসরি তাঁকে সম্বোধন করছেন। তাঁর পক্ষ থেকে অহীর সিলসিলা শুরু হয়ে গেছে এবং তাঁকে তিনি নিজের নবী বানিয়ে নিয়েছেন। এর বেশ কিছুকাল পরে সূরা আল মুদদাসসিরের প্রথম দিকের আয়াতগুলো নাযিল হয়। সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে, নবুওয়াত লাভ করার পর এখন কি কি কাজ করতে হবে।

সূরা আল-আলাক (১-৫) এর মূল শিক্ষা

সূরা আল-আলাক-এর প্রথম ৫টি আয়াত পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাজিলকৃত বাণী, যা শিক্ষার গুরুত্ব, স্রষ্টার প্রতি অনুগত থাকা এবং মানুষের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে আলোকপাত করে। এ আয়াতে আল্লাহর নামে পাঠ করা, সৃষ্টির জ্ঞানার্জন এবং কলমের মাধ্যমে জ্ঞান বিস্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

  • পাঠ বা শিক্ষার গুরুত্ব: "পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন" (আয়াত ১)। এর মাধ্যমে জ্ঞানার্জন শুরু করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর নামে এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য। এটি প্রমাণ করে ইসলামে শিক্ষার ভিত্তি হলো স্রষ্টার পরিচয় ও তাঁর ওপর ঈমান।
  • মানুষের সৃষ্টি রহস্য: "সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে" (আয়াত ২)। মানুষ অত্যন্ত তুচ্ছ একটি অবস্থা (জমাট রক্ত বা 'আলাক') থেকে সৃষ্ট। এই সৃষ্টিতত্ত্বের জ্ঞান মানুষকে অহংকার ছেড়ে বিনয়ী হতে শেখায় এবং স্রষ্টার ক্ষমতার স্বীকৃতি দেয়।
  • জ্ঞানের আধার মহান রব: "পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহামহিমান্বিত" (আয়াত ৩)। তিনি মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন এবং অজানাকে জানিয়েছেন।
  • জ্ঞানের মাধ্যম ও বিস্তার: "যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন" (আয়াত ৪)। জ্ঞান লিখে রাখা এবং তা বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে 'কলম' বা লিখন পদ্ধতির বিশেষ গুরুত্ব এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • মানুষের সীমাবদ্ধতা ও জ্ঞান: "শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না" (আয়াত ৫)। মানুষের নিজস্ব কোনো জ্ঞান নেই; যা কিছু জ্ঞান অর্জিত হয়, তা মহান আল্লাহর অনুগ্রহে বা শিক্ষাতেই সম্ভব।
মূল শিক্ষা: এই আয়াতগুলো মানুষের জীবনের লক্ষ্য, শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা দেয়। কুরআন ও ইসলামের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জাগতিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Top


বই: ইসলামী আন্দোলন ” ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ী”

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহঃ)

এটি ১৯৪০ সনের বক্তৃতা, জামায়াতে ইসলামী তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
[বইয়ের মূল নাম: ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়]

ভূমিকা

'ইসলামী বিপ্লবের পথ' বইটির মূল কথা হলো 'ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা হবে'। এই লক্ষ্যে বইটির লেখক মরহুম মাওলানা মওদুদী (রহঃ) ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচী হলে এ সম্পর্কে এক অনুপম বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যের শিরোনাম ছিল 'ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়', এর অর্থ হলো ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মূল আলোচনা

বইটির মূল আলোচনাকে ৮টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা:

  1. ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়
  2. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন
  3. আদর্শিক রাষ্ট্র
  4. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র
  5. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি বা পন্থা
  6. অবাস্তব কল্পনা বা ধারণা
  7. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা
  8. সংযোজন

১. ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়

  • বর্তমানে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নাম শিশুদের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে।
  • যাঁরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁরা এটা জানেন না কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় এবং জানার চেষ্টাও করেন না।
  • যাঁরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাঁরা যে প্রস্তাব দেয়—মোটর সাইকেলে যেমন আমেরিকায় পৌঁছানো সম্ভব নয়, তেমনি তাঁদের প্রস্তাবে মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

২. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন

“কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক উপায়ে কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
  • একজায়গা থেকে তৈরি করে এনে অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
  • কোনো একটি সমাজের মধ্যকার নৈতিক চরিত্র, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যগত কার্যকারণের সমন্বিত কর্মপ্রক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়।
  • সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে জন্মলাভ করে ইসলামী রাষ্ট্র।
  • সামাজিক উদ্যম, উদ্দীপনা, ঝোঁক-প্রবণতা প্রভৃতির নিবিড় সম্পর্ক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।
  • প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
  • সামাজিক কার্যক্রম ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
  • দীর্ঘ প্রাণান্তকর চেষ্টা প্রয়োজন (যেমন বীজ হতে ফল)।

৩. আদর্শিক রাষ্ট্র

(১) ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য:

  • ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শিক রাষ্ট্র।
  • সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রভাবমুক্ত।

(২) অন্যান্য বিপ্লবের সাথে তুলনা:

  • ফরাসী বিপ্লবে আদর্শিক রাষ্ট্রের ক্ষীণ রশ্মি দেখা গেলেও জাতীয়তাবাদের প্রভাবে চাপা পড়ে তা বিলুপ্ত হয়।
  • রাশিয়ার কম্যুনিজম ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও অতিসত্ত্বর তা আদর্শচ্যুত হয়।
  • মুসলিম দেশের কর্তৃত্বশীল লোকেরা জাতীয়তাবাদের আখড়ায় পড়ে ইসলামী ভাবধারা ও আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা হারিয়ে ফেলেছে।

(৩) আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়নের প্রয়োজন:

  • ভিত্তি স্থাপন হতে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষা করা এবং উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধি করা।
  • জাতীয়তাবাদী চিন্তা-পদ্ধতি ও সংগঠন প্রণালী পরিহার করা।

(৪) আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য:

  • জাতি-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের কাছে এর আদর্শ পেশ করা।
  • সেই আদর্শ অনুযায়ী সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠন করে কল্যাণ সাধন করা।

৪. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র

(ক) ইহার বৈশিষ্ট্য:

  1. ইসলামী রাষ্ট্রের মূল বুনিয়াদ।
  2. নিখিল বিশ্বজগৎ আল্লাহ তাআলার রাজ্য। তিনি ইহার প্রভু, শাসক ও বিধানদাতা।
  3. মানুষ এই দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধি।
  4. খেলাফতের এই দায়িত্বের জন্য প্রত্যেককেই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

(খ) ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ:

  1. এটা ধর্মহীন রাষ্ট্র হতে সম্পূর্ণ আলাদা।
  2. এটা পরিচালনার জন্য এক বিশেষ মনোবৃত্তি, বিশেষ প্রকৃতি এবং বিশেষ ধরনের নির্ধারণ আবশ্যক।
  3. ধর্মহীন রাষ্ট্রের জজ ও প্রধান বিচারপতি ইসলামী রাষ্ট্রের কেরানী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
  4. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগের জন্য খোদাভীতি, নিজ কর্তব্য পালন ও সেজন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহির তীব্র অনুভূতি ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকের প্রয়োজন।

(গ) ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের বৈশিষ্ট্য:

  1. পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি হস্তগত থাকলেও তারা তার পূর্ণ আমানতদার।
  2. রাজশক্তি করায়ত্ত হলেও সুখ-নিদ্রা ত্যাগ করে জনস্বার্থে রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
  3. যুদ্ধে বিজয়ী দেশে হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হয়ে তাদের ইজ্জত-আব্রুর হেফাজতকারী হন।
  4. নিজেদের স্বার্থকে ধূলিসাৎ করে অপরের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন।
  5. আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তারা এমন মর্যাদার অধিকারী হবে যে, তাদের সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিক ও চারিত্রিক মূলনীতির অনুসরণ এবং প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি পালনের ব্যাপারে গোটা বিশ্ব তাদের উপর আস্থাশীল হবে।

৫. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি বা পন্থা

(১) প্রাথমিক পদক্ষেপসমূহ:

  • ইসলামী রাষ্ট্রের কোনো অলৌকিক আবির্ভাব ঘটে না।
  • ইসলামী জীবন দর্শন, চরিত্র ও প্রকৃতির বিশেষ মাপকাঠি অনুযায়ী গঠিত ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি করা। নেতা ও কর্মীদের এই বিশিষ্ট আদর্শে আত্মগঠন করা।
  • সমাজ জীবনে অনুরূপ মনোবৃত্তি ও নৈতিক উদ্দীপনা জাগ্রত করা।
  • ইসলামী আদর্শে নাগরিকদের গড়ে তুলতে একটি অভিনব শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা।
  • জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা ও কাজ করতে সক্ষম এমন লোক গড়ে তোলা।
  • ইসলামী আদর্শের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম জীবনের একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন।
  • ইসলামী আন্দোলন চতুর্পার্শ্বের যাবতীয় অবাঞ্ছিত জীবন-ধারার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সংগ্রাম করবে।

(২) ইহাতে নিম্নোক্ত ফল পাওয়া যাবে:

  • পরীক্ষার অগ্নিদহনে উত্তীর্ণ ত্যাগী লোক তৈরি হবে।
  • এ আন্দোলনে এমনসব লোক পর্যায়ক্রমে যোগদান করবে যাদের প্রকৃতিতে সত্য-ন্যায়ের উপাদান অন্তর্নিহিত রয়েছে।
  • সর্বশেষে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

(৩) যেকোনো ধরনের বিপ্লব সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজন:

  • একটি বিশেষ ধরনের আন্দোলন।
  • বিশেষ ধরনের সামাজিক চেতনা সম্পন্ন নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি (উদাহরণ: রুশ বিপ্লব, জার্মানির সমাজতন্ত্রের বিপ্লব)।

৬. অবাস্তব কল্পনা বা ধারণা

  • কিছু লোকের ধারণা, মুসলিম জাতিকে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে একই প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত ও পরিচালিত করতে পারলেই ইসলামী রাষ্ট্র আপনা আপনিই প্রতিষ্ঠিত হবে।
  • মুসলমানদের বর্তমান নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার স্বরূপ: চরিত্রগত দিক থেকে দুনিয়ার মুসলিম ও অমুসলিম জাতিগুলোর সবগুলোর অবস্থা প্রায় একই। (উদাহরণ: আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্নীতি, রোজার দিনে প্রকাশ্যে খাওয়া, সুদ, ঘুষ, জেনা ইত্যাদির সাথে লিপ্ত হওয়া)।

৭. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা

হযরত মুহাম্মদ (সা) এর কর্মপন্থাই হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা। তাঁর অনুসৃত বিশিষ্ট মূলনীতিসমূহ:

  • ইসলাম হলো সেই আন্দোলনের নাম যা মানব জীবনের গোটা ইমারত নির্মাণ করতে চায় এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
  • ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য সাময়িক কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে নয়।
  • মূল লক্ষ্য আল্লাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বের দাওয়াত দেওয়া।

ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতির চারটি দিক:

ক) আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহ্বান:
  1. বুদ্ধিমান ও বাস্তববাদী হওয়া; তবে বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তববাদিতার দাবি হলো সেই মহান সম্রাটের হুকুমের সম্মুখে মাথা নত করে দেওয়া, তাঁর একান্ত অনুগত দাস হয়ে যাওয়া।
  2. গোটা জাতির একজনই সম্রাট, মালিক এবং সার্বভৌম কর্তা রয়েছেন। অন্য কারো কর্তৃত্ব করার কোনো অধিকার নেই।
  3. আল্লাহ ছাড়া আমি সকলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এবং যারা আল্লাহকে মানে তারা ব্যতিত কারও আনুগত্য নয়।
  4. এই ঘোষণা উচ্চারণ করার সাথে সাথে বিশ্ববাসী আপনার শত্রু হবে এবং চতুর্দিক থেকে বাধা-বিপত্তি বা আক্রমণ নেমে আসবে।
খ) অগ্নি পরীক্ষায় নিখাদ প্রমাণিত হওয়া:
  1. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে বাতিল শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে জোট গঠন করে।
  2. তাদের উপর নেমে আসে কঠিন অত্যাচার এবং এর ফলেই ইসলামী আন্দোলন মজবুত হয় এবং ক্রমবিকাশ ও প্রসার লাভ করে।
  3. এর ফলেই সমাজের মণি-মুক্তাগুলো (উত্তম চরিত্রের লোকেরা) আন্দোলনে শরিক হয়।
  4. বাস্তব ময়দানে কর্মীদের যথার্থ প্রশিক্ষণ হতে থাকে।
  5. সত্যের জন্য মানুষের আত্মত্যাগ দেখে নতুন সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হয়।
গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেল:
  1. বর্তমান ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সেই মহান নেতার (সা) নেতৃত্ব, আদর্শ, সহানুভূতি এবং সার্বিকভাবে তাঁর মডেলকে অনুসরণ করা একান্ত দরকার।
  2. তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক, কিন্তু দ্বীনের দাওয়াতে সব সম্পদ ব্যয় হয়ে যায়।
  3. নেতা ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহনশীল।
  4. ইসলামী আন্দোলনের কাজ ত্যাগ করার বিনিময়ে তাঁকে আরবের রাজত্ব ও ধন-সম্পদের প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।
  5. অত্যন্ত তীব্র গরমের মধ্যে মরুভূমির বালুপথে হেঁটে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন।
ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপ্লব:

ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একদল লোককে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যারা ইসলামের পূর্ণ প্রশিক্ষণ পেয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনে সক্ষম ছিলেন (যেমন: মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র)।

একথা সত্য যে, এ কাজের জন্য প্রয়োজন ঈমান, ইসলামী চেতনা, ঐকান্তিক নিষ্ঠা, মজবুত ইচ্ছাশক্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগ, উচ্ছ্বাস ও স্বার্থের নিঃশর্ত কুরবাণী।

এ কাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার উপর পাহাড়ের মতো অটল হয়ে থাকবে।

দাওয়াত সংক্রান্ত আয়াত:

আল ইমরান-১০৪, ইউসূফ-১০৮, আন নাহল-১২৫, হামীম আস সাজদাহ-৩৩, মায়েদা-৬৭ GO দাওয়াত সংক্রান্ত হাদীস: ১টি হাদীস মুখস্ত করুন GO মাসয়ালা: সিয়াম সংক্রান্ত

এক নজরে সিয়াম বা রোজার জরুরি মাসআলা-মাসায়েল

এক নজরে সিয়াম বা রোজার জরুরি মাসআলা-মাসায়েল

লেখক: শাইখ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

১. সিয়ামের সংজ্ঞা

সিয়াম (الصيام): আরবি শব্দ, এটি বহুবচন। এর একবচন সওম (الصوم)। বাংলায় 'রোজা', যা মূলত ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। সওম-এর শাব্দিক অর্থ: বিরত থাকা

শরিয়তের পরিভাষায়: আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক (ফজর) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকাই হলো সিয়াম বা রোজা।

২. রোজা রাখার বিধান

কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষের ওপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
"হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" [সূরা আল-বাকারা: ১৮৩]

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
"ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ সম্পাদন করা এবং রমজানের রোজা রাখা।" [সহিহ বুখারী: ৮ ও সহিহ মুসলিম: ১৬]

৩. রোজা ফরজ হওয়ার শর্তাবলি

রোজা ফরজ হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই—

  1. মুসলিম হতে হবে: অমুসলিমের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য নয়।
  2. প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে: অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাদের রোজা রাখা আবশ্যক নয়, তবে অভ্যস্ত করার জন্য উৎসাহিত করা উচিত।
  3. সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে: পাগলের ওপর রোজা ফরজ নয়।
  4. শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হবে: অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ, দীর্ঘমেয়াদী রোগী কিংবা শয্যাশায়ী ব্যক্তি যিনি রোজা রাখতে অক্ষম, তাঁর জন্য রোজা রাখা আবশ্যক নয়।
    নোট: প্রচণ্ড ঠান্ডা বা গরমে ভারী কাজ করার কারণে কষ্ট হলে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। এ ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেবে অথবা রাত্রিকালীন কাজ করবে।
  5. শরিয়তের বাধামুক্ত থাকতে হবে: যেমন ঋতুস্রাব বা সন্তান প্রসবোত্তর স্রাবমুক্ত থাকা।

৪. রোজার নিয়ত

  • মনে মনে নিয়ত: মনে মনে রোজা রাখার নিয়ত করা আবশ্যক। মুখে উচ্চারণ করে আরবিতে "নাওয়াইতু আন আসূমা গাদান..." অথবা বাংলায় মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত।
  • সময়: ফজরের পূর্বেই নিয়ত করা আবশ্যক। পুরো মাসের জন্য মাসের শুরুতে একবার নিয়ত করাই যথেষ্ট, তবে প্রতি রাতে আলাদা আলাদা নিয়ত করা উত্তম।
  • বিশেষ দ্রষ্টব্য: কোনো কারণে রোজা ভাঙলে পুনরায় শুরু করার সময় আবার নিয়ত করতে হবে।

৫. রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ

ক. যে কারণে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়:

রোজা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা: রমজান মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে। এর বদলে একটি রোজা কাজা করার পাশাপাশি কাফফারা (টানা ৬০টি রোজা রাখা) আদায় করতে হবে। তা সম্ভব না হলে ৬০ জন গরিব-অসহায় মানুষকে খাবার খাওয়াতে হবে বা খাদ্যদ্রব্য (জনপ্রতি সোয়া কেজি চাল) প্রদান করতে হবে। টাকা দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়।

খ. যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায় কিন্তু শুধু কাজা আবশ্যক হয় (কাফফারা নয়):

  1. ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো খাবার, পানীয় বা ওষুধ গ্রহণ করা। অখাদ্য কিছু (যেমন: পাথর, মাটি) ইচ্ছাকৃত গিলে ফেললেও রোজা ভাঙবে।
  2. ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা: আঙুল দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে মুখ ভরে ইচ্ছাকৃত বমি করলে। তবে অনিচ্ছাকৃত বমি হলে রোজা ভাঙবে না।
  3. নাক বা কানে ওষুধ প্রবেশ করানো: তরল ওষুধ যদি সরাসরি পাকস্থলীতে পৌঁছে যায়।
    রক্ত দান বা হিজামা: অধিক বিশুদ্ধ মতে রোজা ভাঙবে না। তবে সতর্কতার স্বার্থে দিনে না করে রাতে করা ভালো।
  4. ভুলবশত ইফতার বা সেহরি করা: সময় শেষ হওয়ার পর সেহরি খাওয়া বা সময় হওয়ার আগে ইফতার করে ফেলা। অধিক বিশুদ্ধ মতে এই রোজা কাজা করে নিতে হবে।
  5. অসতর্কতাবশত খেলে: ভুলে খেলে রোজা ভাঙবে না, তবে মনে পড়ার সাথে সাথেই পানাহার বন্ধ করে মুখের খাবার ফেলে দিতে হবে।
  6. পিরিয়ড বা প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব: দিনের যেকোনো সময় ঋতুস্রাব শুরু হলে বা বাচ্চা প্রসব হলে রোজা ভেঙে যাবে।

৬. যাদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে (৫টি শ্রেণি)

  • ১. অসুস্থ ব্যক্তি: ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে রোজা ভাঙতে পারবেন এবং পরবর্তীতে সুস্থ হলে কাজা করবেন।
  • ২. মুসাফির: সফরের কারণে কষ্ট হলে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ (পরে কাজা করতে হবে)। কষ্ট না হলে রোজা রাখাই উত্তম।
    "আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ অথবা সফরে আছে (সে অন্য সময়ে কাজা করবে)।" [সূরা আল-বাকারা: ১৮৫]
  • ৩. ঋতুমতী ও প্রসূতি নারী: এই সময় রোজা রাখা নিষেধ। পরে রমজানের পর কাজা করে নিতে হবে।
  • ৪. গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা: নিজের বা বাচ্চার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে রোজা ভাঙতে পারবেন এবং পরে কাজা করবেন। কোনো আশঙ্কা না থাকলে রোজা রাখা মুস্তাহাব।
  • ৫. অতিবৃদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদী রোগী: একেবারেই অক্ষম হলে প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্যদ্রব্য (সোয়া কেজি চাল) ফিদিয়া দিতে হবে।

৭. রোজার মূল শিক্ষা ও উদ্দেশ্য

১. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন

রোজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো মনে আল্লাহর ভয় বা সচেতনতা সৃষ্টি করা। [সূরা বাকারা: ১৮৩]

২. নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ (আত্মশুদ্ধি)

বৈধ চাহিদা পরিহার করার মাধ্যমে মুমিন তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।

৩. ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা

ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে ধৈর্যের গুণ অর্জিত হয়। এটি "ধৈর্যের মাস"।

৪. সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ

অনাহারে থাকার মাধ্যমে দরিদ্রের কষ্টের অনুভূতি জাগ্রত হয়, যা দান-সদকায় উৎসাহিত করে।

৫. আখলাক বা চরিত্রের সংশোধন

মিথ্যা, গিবত ও ঝগড়া থেকে বেঁচে থাকা বাধ্যতামূলক।

مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
"যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ বর্জন করেনি, তার পানাহার বর্জন করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।" [সহিহ বুখারী: ১৯০৩]

৬. শারীরিক সুস্থতা

পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায় এবং বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন) বের হতে সাহায্য করে।

"আর তোমাদের রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পারো।" [সূরা বাকারা: ১৮৪]

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পদ্ধতির আলোকে সিয়াম পালনের তওফিক দান করুন এবং তা কবুল করুন। আমিন।

Top

"সর্বস্বত সংরক্ষিত© ২০২৩ এস এম হোমিওপ্যাথি মেডিকেল সেন্টার; ব্লগঃ ডিজাইনে SIAAM