
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য দরস, বই নোট, বিষয়ভিত্তিক আয়াত-হাদিস ও মাসয়ালা সংকলন
পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী, তাফসীর ও শিক্ষা
নামকরণ: সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখিত আলাক ( خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ) শব্দ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
এই সূরাটির দু’টি অংশ। প্রথম অংশটি (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ) থেকে শুরু হয়ে পঞ্চম আয়াতে (عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ) এ গিয়ে শেষ হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশটি (كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ ) থেকে শুরু হয়ে সূরার শেষ পর্যন্ত চলেছে।
প্রথম অংশটি যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ সর্বপ্রথম অহী এ ব্যাপারেও উম্মাতে মুসলিমার আলেম সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ একমত। এ প্রসংগে ইমাম আহমাদ, বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ অসংখ্য সনদের মাধ্যমে হযরত আয়েশা (রা) থেকে যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তা সর্বাধিক সহীহ হাদীস হিসেবে গণ্য। এ হাদীসে হযরত আয়েশা নিজে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ওহী শুরু হবার সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে বর্ণনা করেছেন।
এ ছাড়াও ইবনে আব্বাস (রা), আবু মূসা আশ’আরী (রা) ও সাহাবীগণের একটি দলও একথা বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম কুরআনের এই আয়াতগুলোই নাযিল হয়েছিল। আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হারম শরীফে নামায পড়া শুরু করেন এবং আবু জেহেল তাঁকে হুমকি দিয়ে তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে তখন দ্বিতীয় অংশটি নাযিল হয়।
মুহাদ্দিসগণ অহীর সূচনাপর্বের ঘটনা নিজের নিজের সনদের মাধ্যমে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম যুহরী এ ঘটনা হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর থেকে এবং তিনি নিজের খালা হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
হযরত আয়েশা (রা) বলেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহীর সূচনা হয় সত্য স্বপ্নের (কোন কোন বর্ণনা অনুসারে ভালো স্বপ্নের) মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, মনে হতো যেন দিনের আলোয় তিনি তা দেখছেন। এরপর তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়েন। এরপর কয়েকদিন হেরা গুহায় অবস্থান করে দিনরাত ইবাদাতের মধ্যে কাটিয়ে দিতে থাকেন, হযরত আয়েশা রা. তাহানুস (طحنوش) শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইমাম যুহরী তা’আব্বুদ (طعبد) বা ইবাদাত - বন্দেগী শব্দের সাহায্যে এর ব্যাখ্যা করেছেন। (এখানে তিনি কোন ধরনের ইবাদাত করতেন? কারণ তখনো পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবাদাতে পদ্ধতি তাঁকে শেখানো হয়নি)
ঘর থেকে খাবার - দাবার নিয়ে তিনি কয়েকদিন সেখানে কাটাতেন। তারপর হযরত খাদীজার (রা) কাছে ফিরে আসতেন। তিনি আবার কয়েক দিনের খাবার সামগ্রী তাঁকে যোগাড় করে দিতেন। একদিন তিনি হেরা গুহার মধ্যে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ওপর ওহী নাযিল হলো। ফেরেশতা এসে তাঁকে বললেন : “পড়ো”।
এর পর হযরত আয়েশা (রা) নিজেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন : আমি বললাম, “আমি তো পড়তে জানি না।” একথায় ফেরেশতা আমাকে ধরে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন। এমনকি আমি তা সহ্য করার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেল্লাম। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ো”। আমি বলালাম, “আমি তো পড়তে জানি না।” তিনি দ্বিতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ধরে ভয়ানক চাপ দিলেন। আমার সহ্য করার শক্তি প্রায় শেষ হতে লাগলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ো”। আমি আবার বলালাম, “আমি তো পড়া জানি না”। তিনি তৃতীয় বার আমাকে বুকের সাথে ভয়ানক জোরে চেপে ধরলেন আমার সহ্য করার শক্তি খতম হবার উপক্রম হলো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ) (পড় নিজের রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন) এখানে থেকে (عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ - যা সে জানতো না) পর্যন্ত।
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁপতে কাঁপতে সেখান থেকে ফিরলেন। তিনি হযরত খাদীজার (রা) কাছে ফিরে এসে বললেন, “আমার গায়ে কিছু (চাঁদর - কম্বল) জড়িয়ে দাও! আমার গায়ে কিছু (চাঁদর - কম্বল) জড়িয়ে দাও!” তখন তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেয়া হলো। তাঁর মধ্য থেকে ভীতির ভাব দূর গেলে তিনি বললেন : “হে খাদীজা! আমার কি হয়ে গেলো?” তারপর তিনি তাঁকে পুরো ঘটনা শুনিয়ে দিলেন এবং বললেন, “আমার নিজের জানের ভয় হচ্ছে।”
হযরত খাদীজা বললেন : “মোটেই না। বরং খুশী হয়ে যান। আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমাণিত করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করেন। সত্য কথা বলেন। (একটি বর্ণনায় বাড়তি বলা হয়েছে, আপনি আমানত পরিশোধ করে দেন, অসহায় লোকদের বোঝা বহন করেন। নিজে অর্থ উপার্জন করে অভাবীদেরকে দেন। মেহমানদারী করেন। ভালো কাজে সাহায্য করেন।)”
তারপর তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই। জাহেলী যুগে তিনি ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আরবী ও ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। হযরত খাদীজা (রা) তাঁকে বললেন, “ভাইজান! আপনার ভাতিজার ঘটনাটা একটু শুনুন।” ওয়ারাকা রসূলুল্লাহকে বললেন : “ভাতিজা! তুমি কি দেখেছো?” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু দেখেছিলেন তা বর্ণনা করছেন। ওয়ারাকা বললেন : “ইনি সেই নামূস (অহী বহনকারী ফেরেশতা) যাকে আল্লাহ মূসার (আ) ওপর নাযিল করেছিলেন। হায়, যদি আমি আপনার নবুওয়াতের জামানায় শক্তিশালী যুবক হতাম! হায়, যদি আমি তখন জীবিত থাকি যখন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে।”
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : “এরা আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেন : “হাঁ, কখনো এমনটি হয়নি, আপনি যা নিয়ে এসেছেন কোন ব্যক্তি তা নিয়ে এসেছে এবং তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। যদি আমি আপনার সেই আমলে বেঁচে থাকি তাহলে আপনাকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করবো।” কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই ওয়ারাকা ইন্তিকাল করেন।
এ ঘটনা নিজেই একথা প্রকাশ করছে যে, ফেরেশতার আসার এক মূহূর্ত আগেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নবী বানিয়ে পাঠানো হবে এ সম্পর্কে তিনি বিন্দুবিসর্গও জানতেন না। তাঁর এই জিনিসের প্রত্যাশী বা আকাংক্ষী হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর সাথে যে এই ধরনের ব্যাপার ঘটতে পারে, একথা তিনি আদৌ কখনো কল্পনা করতে পারেননি। অহী নাযিল হওয়া এবং ফেরেশতার এভাবে সামনে এসে যাওয়া তাঁর জন্যে ছিল একটি আকস্মিক ঘটনা। এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তাঁর ওপর ঠিক তাই হয়েছে যা একজন বেখবর ব্যক্তির সাথে এত বড় একটি আকস্মিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে। এ কারণেই যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এগিয়ে আসেন তখন মক্কার লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধে সব রকমের আপত্তি উঠায় কিন্তু তাদের একজনও একথা বলেনি, আমরা তো আগেই আশংকা করেছিলাম আপনি কোন একটি কিছু হওয়ার দাবী করবেন, কারণ আপনি বেশ কিছু কাল থেকে নবী হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
এ ঘটনা থেকে নবুওয়াতের আগে তাঁর জীবন কেমন পবিত্র ছিল এবং তাঁর চরিত্র ও কর্মকাণ্ড কত উন্নত পর্যায়ের ছিল সে কথাও জানা যায়। হযরত খাদীজা (রা) কোন অল্প বয়স্কা মহিলা ছিলেন না। বরং এই ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল পঞ্চান্ন বছর। পনের বছর ধরে তিনি রসূলের জীবন সঙ্গিনী ছিলেন। স্ত্রীর কাছে স্বামীর কোন দুর্বলতা গোপন থাকতে পারে না। তিনি রসূলুল্লাহর (সা) ৫০ বছরের জিন্দেগীকে এত উন্নত ও পবিত্র হিসেবে পেয়েছিলেন যে, যখনই তিনি তাঁকে হেরা গুহার ঘটনা শুনান তখনই নির্দ্বিধায় তিনি স্বীকার করে নেন যে, যথার্থই আল্লাহর ফেরেশতা তাঁর কাছে অহী নিয়ে এসেছিলেন। অনুরূপভাবে ওয়ারাকা ইবনে নওফলও মক্কার একজন বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ছিলেন। তিনি শৈশব থেকে মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহর (সা) জীবন দেখে আসছিলেন, তাছাড়া পনের বছরের নিকট আত্মীয়তার কারণে তাঁর অবস্থা তিনি আরো গভীরভাবে অবগত ছিলেন। তিনিও এ ঘটনা শুনে একে কোন প্ররোচনা মনে করেননি। বরং শুনার সাথে সাথেই বলে দেন, ইনি সেই একই “নামূস” যিনি মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসেছিলেন। এর অর্থ এই দাঁড়ায় তাঁর মতেও মুহাম্মাদ (সা) এমনই উন্নত ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে, তাঁর নবুওয়াতের মর্যাদা লাভ করা কোন বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কা’বা শরীফে ইসলামী পদ্ধতিতে নামায পড়তে শুরু করেন এবং আবু জেহেল তাঁর হুমকি দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে, ঠিক সে সময় এই সূরার দ্বিতীয় অংশটি নাযিল হয়। দেখা যায়, নবী হবার পর প্রাকশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেবার কাজ শুরু করার আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর শেখানো পদ্ধতিতে হারম শরীফে নামায পড়তে শুরু করেন এবং এ কাজটির কারনে কুরাইশরা প্রথমবার অনুভব করে যে, তিনি কোন নতুন দীনের অনুসারী হয়েছেন। অন্য লোকেরা অবাক চোখে এ দৃশ্য দেখছিল। কিন্তু আবু জেহেল জাহেলী শিরা - উপশিরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং সে এভাবে হারম শরীফে ইবাদাত করা যাবে না বলে তাঁকে ধমকাতে থাকে।
এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে কয়েকটি হাদীসে আবু জেহেলের এতদসংক্রান্ত বিভিন্ন দুষ্কৃতি উল্লেখিত হয়েছে।
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন: আবু জেহেল কুরাইশদেরকে জিজ্ঞেস করে, “মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তোমাদের সামনে যমীনের ওপর মুখ রাখছে?” লোকেরা জবাব দেয়, “হাঁ”। একথায় সে বলল, “লাত ও উয্যার কসম, যদি আমি তাকে এভাবে নামায পড়তে দেখি তাহলে তার ঘাড়ে পা রেখে দেবো এবং মাটিতে তার মুখ রগড়ে দেবো।” তারপর একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামায পড়তে দেখে সে তাঁর ঘাড়ের ওপর পা রাখার জন্যে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্ত হঠাৎ লোকেরা দেখে সে পিছনের দিকে সরে আসছে এবং কোন জিনিস থেকে নিজের মুখ বাঁচাবার চেষ্টা করছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার কি হয়েছে? সে বলে, আমার ও তার মাঝখানে আগুনের একটি পরিখা, একটি ভয়াবহ জিনিস ও কিছু ডানা ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সে যদি আমার ধারে কাছে ঘেঁসতো তাহলে ফেরেশতারা তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। (আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, ইবনুল মুনযির, ইবনে মারদুইয়া, আবু নাঈম ইসফাহানী ও বায়হাকী)
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: আবু জেহেল বলে, যদি আমি মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কা’বার কাছে নামায পড়তে দেখি তাহলে পায়ের নীচে তার ঘাড় চেপে ধরবো। একথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে পৌঁছে যায়। তিনি বলেন, যদি সে এমনটি করে তাহলে ফেরেশতারা প্রকাশ্যে তাকে এসে ধরবে। (বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে জারীর, আবদুর রাজ্জাক, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনুল মুনযির ও ইবনে মারদুইয়া)
ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে: রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়ছিলেন, আবু জেহেল সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। সে বললো, হে মুহাম্মাদ! আমি কি তোমাকে এ থেকে নিষেধ করিনি? একথা বলে সে তাঁকে ধমকাতে শুরু করলো। জবাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কঠোরভাবে ধমক দিলেন। তাঁর ধমকানি শুনে সে বললো, হে মুহাম্মাদ! কিসের জোরে তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো? আল্লাহর কসম! এই উপত্যকায় আমার সমর্থকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে জারীর, ইবনে আবী শাইবা, ইবনুল মুনযির, তাবারানী ও ইবনে মারদুইয়া)
এ ঘটনাবলীর কারণে (كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ) থেকে সূরার যে অংশটি শুরু হচ্ছে সেটি নাযিল হয়। কুরআনের এই সূরাটিতে এই অংশটিকে যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে স্বাভাবিকভাবে এর মর্যাদা তাই হওয়া উচিত। কারণ প্রথম অহী নাযিল হবার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের প্রথম প্রকাশ করেন নামাযের মাধ্যমে এবং এই ঘটনার ভিত্তিতেই কাফেরদের সাথে তাঁর প্রথম সংঘাত হয়।
পড়ো (হে নবী), তোমার রবের নামে ৷ যিনি সৃষ্টি করেছেন৷
জমাট বাঁধা রক্তের দলা থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন৷
পড়ো, এবং তোমার রব বড় মেহেরবান,
যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন৷
মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না৷
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল সেগুলোর আলোচনা এখান পর্যন্ত শেষ। যেমন হযরত আয়েশার (রা) হাদীস থেকে জানা যায়: এই প্রথম অভিজ্ঞতাটি খুব বেশী কঠিন ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাইতে বেশী বরদাশত করতে পারতেন না। তাই তখন কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে যে, তিনি যে রবকে প্রথম থেকে জানেন ও মানেন তিনি সরাসরি তাঁকে সম্বোধন করছেন। তাঁর পক্ষ থেকে অহীর সিলসিলা শুরু হয়ে গেছে এবং তাঁকে তিনি নিজের নবী বানিয়ে নিয়েছেন। এর বেশ কিছুকাল পরে সূরা আল মুদদাসসিরের প্রথম দিকের আয়াতগুলো নাযিল হয়। সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে, নবুওয়াত লাভ করার পর এখন কি কি কাজ করতে হবে।
সূরা আল-আলাক-এর প্রথম ৫টি আয়াত পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাজিলকৃত বাণী, যা শিক্ষার গুরুত্ব, স্রষ্টার প্রতি অনুগত থাকা এবং মানুষের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে আলোকপাত করে। এ আয়াতে আল্লাহর নামে পাঠ করা, সৃষ্টির জ্ঞানার্জন এবং কলমের মাধ্যমে জ্ঞান বিস্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহঃ)
এটি ১৯৪০ সনের বক্তৃতা, জামায়াতে ইসলামী তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
[বইয়ের মূল নাম: ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়]
'ইসলামী বিপ্লবের পথ' বইটির মূল কথা হলো 'ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা হবে'। এই লক্ষ্যে বইটির লেখক মরহুম মাওলানা মওদুদী (রহঃ) ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচী হলে এ সম্পর্কে এক অনুপম বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যের শিরোনাম ছিল 'ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়', এর অর্থ হলো ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বইটির মূল আলোচনাকে ৮টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা:
“কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক উপায়ে কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর কর্মপন্থাই হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা। তাঁর অনুসৃত বিশিষ্ট মূলনীতিসমূহ:
ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একদল লোককে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যারা ইসলামের পূর্ণ প্রশিক্ষণ পেয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনে সক্ষম ছিলেন (যেমন: মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র)।
একথা সত্য যে, এ কাজের জন্য প্রয়োজন ঈমান, ইসলামী চেতনা, ঐকান্তিক নিষ্ঠা, মজবুত ইচ্ছাশক্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগ, উচ্ছ্বাস ও স্বার্থের নিঃশর্ত কুরবাণী।
এ কাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার উপর পাহাড়ের মতো অটল হয়ে থাকবে।
সিয়াম (الصيام): আরবি শব্দ, এটি বহুবচন। এর একবচন সওম (الصوم)। বাংলায় 'রোজা', যা মূলত ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। সওম-এর শাব্দিক অর্থ: বিরত থাকা।
শরিয়তের পরিভাষায়: আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক (ফজর) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকাই হলো সিয়াম বা রোজা।
কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষের ওপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
"হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" [সূরা আল-বাকারা: ১৮৩]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
"ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ সম্পাদন করা এবং রমজানের রোজা রাখা।" [সহিহ বুখারী: ৮ ও সহিহ মুসলিম: ১৬]
রোজা ফরজ হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই—
রোজা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা: রমজান মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে। এর বদলে একটি রোজা কাজা করার পাশাপাশি কাফফারা (টানা ৬০টি রোজা রাখা) আদায় করতে হবে। তা সম্ভব না হলে ৬০ জন গরিব-অসহায় মানুষকে খাবার খাওয়াতে হবে বা খাদ্যদ্রব্য (জনপ্রতি সোয়া কেজি চাল) প্রদান করতে হবে। টাকা দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়।
"আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ অথবা সফরে আছে (সে অন্য সময়ে কাজা করবে)।" [সূরা আল-বাকারা: ১৮৫]
রোজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো মনে আল্লাহর ভয় বা সচেতনতা সৃষ্টি করা। [সূরা বাকারা: ১৮৩]
বৈধ চাহিদা পরিহার করার মাধ্যমে মুমিন তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।
ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে ধৈর্যের গুণ অর্জিত হয়। এটি "ধৈর্যের মাস"।
অনাহারে থাকার মাধ্যমে দরিদ্রের কষ্টের অনুভূতি জাগ্রত হয়, যা দান-সদকায় উৎসাহিত করে।
মিথ্যা, গিবত ও ঝগড়া থেকে বেঁচে থাকা বাধ্যতামূলক।
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
"যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ বর্জন করেনি, তার পানাহার বর্জন করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।" [সহিহ বুখারী: ১৯০৩]
পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায় এবং বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন) বের হতে সাহায্য করে।
"আর তোমাদের রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পারো।" [সূরা বাকারা: ১৮৪]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পদ্ধতির আলোকে সিয়াম পালনের তওফিক দান করুন এবং তা কবুল করুন। আমিন।